সোয়ালো পাখির কাহিনী

সোয়ালো পাখির কাহিনী

সোয়ালো পাখির কাহিনী

‘আমাদের এখানে শীতটা খুব মজার, তাই না?’ বললো জয়া, ‘একটু হিম হিম ভাব। উজ্জ্বল আকাশ। কি সুন্দর!’
‘ধ্যুৎ, হিম হিম ভাবই যদি হবে আর উজ্জ্বল আকাশই থাকবে তাহলে আর শীত হলো নাকি?’ বললাম আমি, ‘শীত হবে শীতের মতো। তুষার ঝরবে অবিরল বৃষ্টির মতো। ঘরের ছাদ, রাস্তা ঘাট মাঠ সব শাদা হয়ে যাবে। ঘরের দরোজা জানালা সব থাকবে বন্ধ। ভেতরে জ্বলবে গনগনে আগুন, জানালার ভেতর দিয়ে তুষার দেখবি, তবেই না শীত।

আমার ঝুনুচাচা কি বলেছেন জানিস, হাঙ্গেরির গ্রামগুলিতে শীতকালে নাকি ভীষণ শীত পড়ে। আর প্রথম যেদিন তুষার ঝরে সেদিন গ্রামের রেঁস্তোরায় টাম্বুরিন বাজিয়ে সবাই তুষারপাতকে স্বাগত জানায়। আমাদের এখানকার শীত অনেকটা আমেরিকার অটামের মতো।’ অটাম শব্দটা আমি নুতন শিখেছি ঝুনুচাচার কাছে।

‘অটাম মানে?’ জিজ্ঞেস করে জয়া।

‘শরতকাল আর কি!’ বলি আমি, ‘ঐ সময় আমেরিকার মফস্বল শহরগুলি পাতায় পাতায় ঢেকে যায়। রাস্তায়, অলিতে গলিতে, উঠোনে, বাড়ির ছাদে লাল বাদামি হলুদ পাতা জমে ওঠে।’ আহ্, চারদিকে ঝরা পাতার গন্ধ, একবার, বুঝেছিস ঝুনুচাচা গেছেন কানেকটিকাটে’

‘ফের তোর ঝুনুচাচার গল্প শুরু হলো’, ঠোঁট উলটে বলল জয়া, ‘তোর চাচা তোকে সব বানিয়ে বানিয়ে বলেন, আর তুইতো একটা বুদ্ধু, যা বলা হয় তাই বিশ্বাস করিস।’

প্রথমত আমাকে বুদ্ধু এবং দ্বিতীয়ত ঝুনুচাচাকে মিথ্যুক বলায় আমি চটে গেলাম। বেশি রেগে গেলে আমার আবার কথা আটকে যায়। তোতলাতে তোতলাতে বললাম, ‘যা যা বাসায় যা, পড়িসতো মাত্র আটের ক্লাসে। মুখ্যু মেয়ে এর চেয়ে বেশি আর কি জানবি!’

একদিকে নদী। পাশে জেটি। জেটিতে বাঁধা সারসার জাহাজ। কোনোটা এসেছে লন্ডন থেকে, কোনোটা ফ্লোরিডা থেকে, কোনোটা বা দার এস সালাম থেকে। জেটির সীমানা শেষে সরকারি হাইওয়ে। হাইওয়ে পেরিয়ে কিছুদূর হেঁটে এলে আমাদের বাড়ি। পাড়াটা সবেমাত্র গড়ে উঠছে। আশপাশে তিন-চারটে বাড়ি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারপাশে অনেকগুলি নারকেল গাছ। দুটো পুকুর! পুকুর পাড়ে করবী আর কুলগাছ। কয়েকটি নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। চারপাশে ভাঙ্গা ইটের টুকরো।

নিঝুম মস্ত বাড়ি আমাদের। ঘরগুলো অন্ধকার। উঠোনের এককোণে মস্তো এক কড়ই গাছ। সারা বাড়িতে অবসর সময়ে আমাকে ঘুরে বেড়াতে হয়। কারণ করার কিচ্ছু নেই। নতুন বইপত্র এখানে পাওয়া যায় না। আশপাশের বাড়িতে অবশ্য কয়েকটি ছেলে মেয়ে আছে। কিন্তু তারা সবাই আমার হাঁটু সমান। একমাত্র ঐ হলদে বাড়ির জয়াই আমার সমবয়সী।

এই মস্ত বড় বাড়িতে থাকতে আমার একটুও ভালো লাগে না। বাবা সকালে অফিসে চলে যান, ফেরেন কখনো বিকেলে কখনো বা রাত্রিরে। একা বাড়িতে থাকতে মার ভালো লাগে না, তাই তিনি চাকরি নিয়েছেন। একবার মার সামনে বিড়বিড় করে বলেছিলাম, ‘আমার একটা ভাই বোন থাকলে বেশ হতো!’ এ কথা শুনে মা আমাকে ‘ধাড়ি ছেলে,’ ‘পাকা ছেলে’ বলে এ্যায়সা ধমক দিলেন যে আমি আর কোন কথাই খুঁজে পাইনি। কি যে দোষ করেছি বুঝতেও পারলাম না।

বাবা মা’রা বোধহয় শুধু শুধু ধমকাতে ভালোবাসেন। এই একঘেঁয়ে দিনগুলি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যখন ঝুনুচাচা আসেন। ঝুনুচাচা চাকরি করেন বিরাট এক জাহাজে। বছরে একবার কি দু’বার এ বন্দরে তাঁর জাহাজ নোঙ্গর করে। তখন মোটাসোটা, বেঁটেখাটো মাথায় টাক এবং গোঁফঅলা ঝুনুচাচা দু’হাতে দুটো স্যুটকেস নিয়ে হাজির হন। উঠোন থেকেই তাঁর চিৎকার শুরু হয়, ‘কইগো ভাবী তোমরা কই, দেখো ফের চলে এলাম। কই গেলিরে মামনা।’ জয়া যদি আমায় মামনা বলে ডাকতো তা’লে হয়ত একটা রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যেতো! কিন্তু ঝুনুচাচা মামনা বললে আমি রাগ করি না।

এরপর ঝুনুচাচা তার স্যুটকেশ খোলেন। ‘এই যে ভাবী ন্যুইয়র্ক থেকে এই কার্ডিগানটা এনেছি তোমার জন্যে। মিয়াভাইয়ের জন্যে এই স্যুটের কাপড়। আর মামনা দেখ তোর জন্যে এসব।’

মা তখন তাড়া দেন, ‘যাও যাও হাতমুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নাও। এসব পরে দেখা যাবে।’ কিন্তু ততক্ষণে আমি জেঁকে বসি ঝুনুচাচার কাছে। ‘এই দেখ এই কাঠের মূর্তিটা এনেছি তোর জন্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে।’ এই যে মুখোশটা, এটা আফ্রিকার একটি ছোট্ট শহর, কি যেন নাম, ভুলেই গেলাম, যাক আর এই কিমানো পড়া মেমসাহেবটা টোকিও থেকে। পছন্দ হয়?’

পছন্দ হবে না আবার! ঝুনুচাচা জানেন আমি মা-বাবার মতো কাপড়-চোপড় পেলে খুশি হই না। বরং জানা অজানা বন্দর থেকে কেনা এইসব জিনিসের প্রতি আমার আকর্ষণ বেশি। ঝুনুচাচা বলেন, ‘দেখ দেখ এগুলি দেখ, আমি ততোক্ষণে গোসলটা সেরে আসি। বিকেলে তোকে জাহাজে নিয়ে যাবো।’

আমি জাপানি পুতুলটার ঘ্রাণ নেই। চোখের সামনে ভেসে ওঠে টোকিও শহর। বসন্তকালে চেরি ফুলে ছেয়ে যায় টোকিও। আচ্ছা শীতে ফুজিয়ামাকে কেমন লাগে দেখতে? আফ্রিকার মুখোশটির ঘ্রাণ নেই। আহ্, আফ্রিকার নির্জন কোন অন্ধকার গ্রামের খোলা মাঠে বোধহয় দ্রিম দ্রিম করে ঢোল বাজছে। মাঠের মাঝখানে গনগনে আগুন। এমনি মুখোশ পড়ে, বুকে পিঠে নানারকম আলপনা এঁকে হয়তো কালো-কালো কিছু লোক আগুন ঘিরে হৈ হৈ করে নাচছে।

বিকেলে ঝুনুচাচা আমাকে তার জাহাজে নিযে যান। ছোট্ট কেবিন। বয়কে ডেকে তিনি স্যান্ডউইচ আনান। সালাদ আর স্যান্ডউইচ খাওয়া হলে আমরা রেলিং ধরে গল্প করি। আমি বলি ‘ঝুনুচাচা তোমার খারাপ লাগে না। একলা একলা ঘুরে বেড়াও কোথায় কোথায়। বাংলা বলার লোক পর্যন্ত পাও না।’

ঝুনুচাচা উত্তর দেন, ‘না খারাপ লাগবে কেন? বরং ডাঙ্গায় থাকলে আমার কষ্ট হয়। আর সমুদ্রের কি দেখার শেষ আছে! যতো দেখবি ততোই মনে হবে আরো কি যেন বাকি রয়ে গেলো। আর সেটা জানতে না জানতেই তুই পৌঁছে যাস কোনো এক বন্দরে। আর বন্দরের সব জানতে না জানতেই আবার ভাসিস সমুদ্রে।’

আমি বলি, ‘তবুও…’, ঝুনুচাচা বলেন, ‘শোন তবে। তখন আমার জাহাজ ম্যাডিটেরিনিয়ানে। একদিন হঠাৎ তোদের কথা ভেবে খুব মন খারাপ হয়ে গেলো। বিকেল তখন, সূর্য ডুবছে। জাহাজ চলছে আপন মনে। হঠাৎ দেখি একঝাঁক সোয়ালো পাখি কলরব করতে করতে এসে বসলো জাহাজের রেলিংয়ে, মাস্তুলে। একটি দু’টি নয়, এক ঝাঁক। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তারা বোধহয় উড়াল দিয়েছে স্পেন থেকে, যাবে অন্য কোন দেশে। পথে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তাই একটু বিশ্রাম নিচ্ছে।

পরদিন খুব ভোরে আবার তারা পাখা মেললো। হয়ত অনেক দেশ, সমুদ্র পেরিয়ে এই বাংলাদেশেই আসবে। যেই না ওরা পাখা মেললো, বুঝেছিস, অমনি আমিও একটি সোয়ালো পাখি হয়ে গেলাম। তারা মিলিয়ে গেলো দূরে, সঙ্গে সঙ্গে আমিও। উড়তে উড়তে অনেক দেশ ঘুরে এলাম তোদের এখানে। মিয়াভাই’র সঙ্গে গল্প করলাম। ভাবীর সঙ্গে গল্প করলাম। তোর সঙ্গে গল্প করলাম। বুঝেছিস, মাঝে মাঝে একটু খারাপ লাগে। কিন্তু যখনই মন খারাপ হয় তখনই আমি সোয়ালো পাখি হয়ে যাই। মন আমার ঠিক হয়ে যায়।’

ঝুনুচাচা শেষবার এসেছিলেন সেই সাত মাস আগে। পুতুল মুখোশ সব এখন পুরনো হয়ে গেছে। ঘরের অন্ধকার আর গাছের ছায়া আবার চেপে বসেছে মনের ওপর। ম্যাট্রিক পরীক্ষার বাকি আর মাত্র কয়েকমাস। কিছু পড়াশোনা হয়নি। ভালো লাগে না আর। এবার ছুটি হলে আমি নানাবাড়ি চলে যাবো। সেখানে গেলে সারাক্ষণ নানা নানী মামা খালারা ঘিরে রাখে। কেউ গম্ভীর মুখে কথা বলে না। আই.এ.টা আমি সেখানেই পড়বো। বাবা-মা থাকুক তাঁদের অফিস নিয়ে।

কি করা যায়? কি করা যায়? হঠাৎ আমি একটা সোয়ালো পাখি হয়ে যাই। নরওয়েতে এবার শীতটা একটু বেশি মনে হচ্ছে। রোদালো দিন দরকার। আমরা এক ঝাঁক সোয়ালো ডানা মেলি, গন্তব্য আমাদের এখন গ্রানাডা শহর। সেখানে কিছুকাল কাটিয়ে বিশ্রাম নিতে যাবো এথেন্সের জলপাই বনে। তারপর আবার উড়াল। নায়েগ্রা জলপ্রপাতের ধারে ঘাসের বনে কিছুদিন কাটিয়ে-

‘কি রে হা করে কি ভাবছিস?’ জয়ার গলা। আমার ভীষণ রাগ হয়। পরশু আমাকে বুদ্ধু বললো। আজ সারাটা দিন আমি একলা বসে আর এই বিকেলে এসে কিনা…। আমি কিছু বলি না। জয়া বলে, ‘কি রে চটে আছিস মনে হচ্ছে। আমি আরো ভাবলাম…।’

আমি চুপ করে খুঁজে পেতে বইটা আনলাম..’। ‘কি বই’, এবার আমি আগ্রহ দেখাই। ‘ক্যাপ্টেন কুকের সমুদ্রযাত্রা।’ থাক তুই যখন রাগ করে আছিস…তখন কি আর করা। যাই।’

‘আরে না, না, রাগ করলাম কই। বোস বোস দেখি বইটা।’

আমরা সিঁড়িতে বসে গল্প করি। আমি বলি, ‘আর মোটে তিনবছর, তার পরই আমি হাওয়া।’

‘মানে…’

‘আই.এ. পাশ করেই আমি জাহাজে ঢুকে যাবো। সাদা পোশাক, কালো-সাদা টুপি। এ বন্দর থেকে ও বন্দরে ঘুরে বেড়াবো। যখন ফিরব তখন স্যুটকেশ ভর্তি করে রাজ্যের জিনিসপত্র নিয়ে আসবো। কি মজা তাই না?’

‘না, ঐ জাহাজ টাহাজে চাকরি বাকরির কোন দরকার নেই, কখন টুপ করে ডুবে যাবে সমুদ্রে তার কোন ঠিক আছে। ঐ সবের কোন দরকার নেই।’ মেয়েটা যে কি! আমি যা বলি ঠিক তার উল্টোটি বলা চাই-ই। আমার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকি। হঠাৎ জাহাজের ভোঁ শোনা যায়। বন্দরে নতুন জাহাজ এলা বোধ হয়। আমার মন আবার ভালো হয়ে ওঠে। তখন আমি জয়াকে সেই সোয়ালো পাখির গল্প বলি।

পুরোটা শুনে জয়া জিজ্ঞেস করে, ‘সোয়ালো মানে কি?’

‘সোয়ালো মানে জানিস না আবার ক্লাশ এইটে পড়িস। সোয়ালো মানে দোয়েল।’ এইবার তার ওপর একচোট নিতে পরায় খুব খুশি হয়ে উঠি।

‘ওহ তাই। তা দোয়েল বললেই হয়। কি নরম আর সুন্দর নাম। সোয়ালো সোয়ালো করস ক্যান?’

রাগ করে আমি বলি, ‘দেখ জয়া বেশি ফ্যাচ ফ্যাচ করিস না। যা বলি তাই শুনবি। বড়দের কথার ওপর কথা বলতে নেই।’

‘ই, কি আমার গুরুজনরে!’ বলে ভেংচি কেটে জয়া চলে গেলো।

অটাম মানে শরতে আমাদের পরীক্ষা। পুরো বছরের পড়া কয়েক মাসে শেষ করতে হবে। বাসায় থাকি সারাদিন। পড়ি। পড়তে পড়তে ক্লান্ত লাগলে দূরে জাহাজের মাস্তুলের দিকে তাকিয়ে থাকি। জয়ার সঙ্গেও তেমন দেখা হয় না আজকাল।

পরীক্ষার আর কয়েকদিন বাকি। এমনি সময়, একদিন সন্ধ্যায়, জয়া এসে জাহির। বললো ‘কিরে খুব পড়ছিস বুঝি। পড় পড় ভালো রেজাল্ট করা চাই।’

আমি বলি, ‘উপদেশ দিতে হবে না। কি ব্যাপার তাই বল।’

‘কেন তুই কিছু জানিস না। আমরা যে চলে যাচ্ছি।’

‘চলে যাচ্ছিস, কই?’ এবার আমি খুব অবাক হযে জিজ্ঞেস করি।

‘চন্দনপুর।’

‘সে আবার কোথায়?’

‘ঐ যশোরের দিকে। নিরিবিলি জায়গা। কি মজা তাই না?’

আমি বললাম, ‘এর মধ্যে মজার কি? তুইও যাবি নাকি?’

‘আরে তোকে কি আর সাধে বুদ্ধু বলি। আমরার মধ্যে কি আমি পড়ছি না।’

জয়া যেমনি এসেছিল তেমনি চলে গেল। আমার আর পড়ায় মন বসল না। যেদিন জয়ারা চলে যাবে, সেদিন তাদের বিদায় দিতে আমি বাবা আর মা গেলাম স্টেশনে। জয়া ট্রেনের জানালা দিলে গলা বাড়িয়ে বললো, ‘পরীক্ষা দিয়েই যাবি কিন্তু আমাদের ওখানে, নয়তো আমি রাগ করবো।’

‘রাগ আবার কিরে!’ বললাম আমি, ‘ওখানে কতো বন্ধু-বান্ধব পাবি।’ কথাটা বললাম বটে কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেলো। জয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, এতোদিন এখানে থাকলি, এখন আবার চলে যাচ্ছিস নতুন জায়গায়, সেখানে গিয়ে খারাপ লাগবে না?’

জয়া একটু হেসে বললো, ‘খারাপ লাগলে আর কি করবো?…একটা সোয়ালো পাখি হয়ে যাবো।’

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published.