আর সকলের মত কিশোর কুমারের গান আমার খুব প্রিয়, কিন্তু ইচ্ছে করেই শুনি না আর। শুনলেই চোখ দুটো ঝাপসা হতে হতে ক্লান্ত হয়ে যায়। তারপর কোথা থেকে একের পর এক স্মৃতি চোখের সামনে দ্রুত স্পস্ট হতে থাকে। সাথে সাথে কিশোর কুমারের গান আর আমার দীর্ঘশ্বাস একে অপরের বন্ধু হয়ে যায়।

“আশা ছিলো, ভালবাসা ছিলো, আজ আশা নেই,ভালবাসা নেই”-এ অন্যরকম এক বিরহ গাঁথা,কারণটা হলো আপনজন,প্রিয়জনকে হারানোর নিদারুণ কষ্ট, যার গেছে সেই শুধু জানে। সে প্রিয়জন আমার একমাত্র বড়ভাই ফয়সাল হাসান পাশা। যিনি ১২বছর আগে ৪২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।আজ কিশোর কুমারের গান শুনছি সেই সাত সকাল থেকেই।“একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে’ যখন গাইতো, বাইরে থেকে শুনলে আপনি আলাদা করতে পারবেন না, সত্যিই কিশোর কুমার বাদ্য যন্ত্র ছাড়াই আমাদের বাসায় গাইছে কিনা। কী চমৎকার ছিলো গানের কন্ঠ, বিশেষ করে কিশোর কুমারের গানের বেলায় ছিলো একছত্র আধিপত্য। না সে কোন প্রফেশনাল কিংবা জনপ্রিয় গায়ক ছিলো না। মঞ্চে গায়নি কখনো। তবে, আমরা এবং আমাদের বাসার আশে পাশের মানুষ মন দিয়ে ঠিক শুনতো তার গান। আমাদের পাশের বাসার পরহেজগার মামীও তাদের জানালার ধারে এসে কান পেতে থাকতো যখন ভাইজান খোলা গলায় আমাদের বাসায় গান গাইতো। ”আমার পূজার ফুল, ভালবাসা হয়ে গেছে তুমি যেন ভূল বুঝ না’ –সে ফূল ঝরে গেছে বড় অকালেই, আরো তো বোঝার ছিলো ভাইজান? আমাদের ভূল বুঝে চলে যাননি তো? –না সে ওরকম মানুষ ছিলো না। খুব প্রাণবন্ত,উচ্ছল, উদার মনের মানুষ ছিলো, কোন কিছু মনে গেঁথে রাখতো না।

আমাদের খুব প্রিয় ভাইটিকে দেখি না কত দিন! বাবা-মা চলে যাওয়ার বেদনা- কষ্ট সহ্য হয়েছে কিন্তু অকালে, মাত্র ৪২ বছর বয়সে ভাইজানের প্রয়াণ—মেনে নেয়া এখনো কষ্টকর। আমরা সবাই ডাকতাম তাকে ভাইজান। সেই ‘ভাই’ আসলেই আমাদের ’জান’ ছিলো-এখন আরো বুঝি গভীর করে। ’আশা ছিলো ভালবাসা ছিলো, আজ আশা নেই ভালবাসা নেই’ বলতে ইচ্ছে করে আজ পাশা নেই, আমাদের ভাইজান নেই। ‘এই সেই কৃষ্ণচূড়া, যার তলে দাঁড়িয়ে হাতে হাত,চোখে চোখ রেখে কথা যেত হারিয়ে’ আমাদের সেই কৃষ্ণচূড়া রুপী সংসারের আশার প্রদীপ জ্বেলেছিলো সে এক হাতেই, দায়িত্বের সাথেই। ছোট বেলা থেকেই একটু অন্যরকম ছিলো। হঠাৎ হঠাৎ করে হারিয়ে যেত। আমার বোন, মা, প্যারিসভাই, খালা, মামা সবাই দু:চিন্তা করতো কোথায় গেল পাশা? মায়ের চোখে কান্না, আব্বা কোন কথা না বলে, মাঝে মাঝে দীঘ শ্বাস বুকে চেপে খুঁজে বেড়াতো আমার ভাইকে। আমি তো তখন অনেক ছোট, টু কী থ্রিতে পড়ি। রাত জেড়ে জেগে আমি আর আপা দোয়া পড়তাম, আল্লাহ ভাইজানকে তাড়াতাড়ি এনে দাও। ৫/৭ দিন পর আমার প্রিয় ফুলু মামার ঢাকার ঠিকানা থেকে চিঠি আসতো- কাদের ভাই, পাশা তো হঠাৎ আমার এখানে, বুঝছি ও নাবলে আসছে, আপনারো চিন্তা করবেন না” ( কাদের আমার আব্বার নাম, সম্পর্কে মামার ছোট হলেও সে কখনো নাম ধরে ডাকতো না।) -এরকম আরো হয়েছিলো। ভাইজান তার অজান্তেই প্রতিটি দৃশ্যপট তৈরি করে গেছে, সে কথা সে জানতো জন্যেই বুঝি–‘আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় তুলে রাখো ,আমায় পড়বে মনে, কাছে দূরে যেখানেই থাকো’- খুব মনে পড়ে ভাইজান- -খুউব। মনে পড়ে, তোমার সেই নিজেকে কোন সাহায্য ছাড়াই প্রতিষ্ঠা করার সময়গুলো, অনেকের তাচ্ছিল্য- কাছের মানুষদের উৎসাহ- সবই মনে পড়ে। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার, যুগে যুগে আমি তোমারই ’ যখন গাইতো- মনে হতো এ এক বিশ্ব প্রেমিক। খুব সম্ভবত ১০ বছর প্রেমের পর ভাবীর সাথে তার বিয়ে হয়েছিলো।

‘এ জীবন ফুরিয়ে যেদিন পাবো এক নতুন জীবন, সেদিনো হবে একাকার দু’জনার এই দুটি মন’— এখন কোন জীবনে আছে আমার ভাইজান, সেখানেও কী এভাবেই মিষ্টি গলায় গান শুনিয়ে যাচ্ছে ওপারের বাসিন্দাদের। আমার ভাই, চার বছর লিভার সিরোসিসের সাথে লড়াই করে ২০০৮ সালের ৯ জানুয়ারি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমার সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্য ছিলো প্রায় ১০ বছর বা তারও বেশি। ভাইজান আর আপা ( আমার একমাত্র বোন) পিঠাপিঠি না হলেও, দুজনের মধ্যে সখ্যতা ছিলো বন্ধুর মত। বলা যায় ভাইজানের বিয়ের আয়োজন আপাই করেছে। আর আপার প্রতি তার দায়িত্ব ও ভালবাসাও ছিলো অফুরন্ত। খুব মনে আছে, আমি অনেক ছোট, নানা বাড়ি সবাই গেছি, একা আসবে না, আমাকে বলতো , বাড়ি চল, তোর তো বিয়ে, বাসায় মাইক বাজছে, তারপর সারা রাস্তায় অনেক গল্প শুনিয়ে বাসায় পেঁছে দেখি কোন মাইক বাজে না, বিয়ের আয়োজন নেই। বলেছিলো, দূর পাগলা, তোকে আনার জন্যেই এসব বলেছি। আমার ২৭ বছর বয়সে আমার বিয়ের সব আয়োজন ভাইজানই করেছে। মাইকের বদলে ক্যসেট প্লেয়ারে ফুল ভলিউমে গান বেজেছে।

“তোমরা যতই আঘাত করো নেই কো অপমান,শুধু আমায় দাও গো সুযোগ শোনাতে এই গান’ —ভাইজান কোন কষ্ট দিয়েছি কী? ক্ষমা করে দিও ভাই, তোমাকে সৃষ্টিকর্তা স্বর্গবাসী করুক, আমাদের কোন পূণ্য থাকলে, সেটাও তোমার জন্য আল্লাহ তা কবুল করে নিক।

‘তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে আমার মরণ যাত্রা যেদিন যাবে’– আমাদের বাসার সামনে দিয়ে বাবার কাঁধে, আমার- আমার দুলাভাইয়ের এবং অন্যদের কাঁধে চেপে কবরস্থানে নিয়ে গিয়েছি আমরা আমাদের ভাইজানকে, সেদিন তার সুন্দর ফর্সা, সুদর্শন চেহারাটা প্রাণহীন নিথর দেহে কী যে শান্তিময় লাগছিলো দেখতে! সেদিন আমার আব্বা তার জীবনের সবচেয়ে ভারী জিনিসটি বহন করেছিলো নি:শব্দে, পাহাড়সম কষ্ট বুকে পুষে। খাটিয়ায় সকলের কাঁধে চেপে যেত যেতে ভাইজান আমাদেরকে শান্তনা দিয়ে বলেছিলো বোধহয়– ‘এই তো জীবন, হিংসা বিবাদ লোভ সব শেষ—– কেন দিসরে চুমুক তবে বিষয়ের বিষে, সবই তো ধুলোয় যাবে মিশে,– থাকবে না গায়ে তোর ঝলমলে দামি ঐ বেশ—”।

সব সময় পরিপাটি, স্টাইলশ ছিলো। বরীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তো আর আমাকে মুখ হা করে মিনিটের পর মিনিট শব্দ করে নি:শ্বাস নিতে বলতো, যাতে ঝড়ের আবহ সৃষ্টি হয়। বড় ছেলে বলে ভাইজানের প্রতি আব্বার অন্যরকম একটা টান ছিলো। যতদিন সক্ষম ছিলো আমার আব্বা-মায়ের জন্য পরিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে গেছে। তার সে দেখানো পথে আমার বোন-ভাবী-দুলাইভাই আমার বাবা-মার প্রতি দায়িত্ব পালন করে গেছে।
কিন্তু ‘নিয়তি আমার ভাগ্য লয়ে যে নিশিদিন খেলা করে’-এর মতই দিন শেষে সেই নিয়তির কাছেরই আমাদের পরাজয়। কিশোর কুমারের ’কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে’ – কেন গাইতো অত মন দিয়ে? অকালে এভাবে অমাদের ছেড়ে চলে যাবে বলে? কী জানি, জানা নেই—‘জানি যেখানেই থাকো, এখনো তুমি যে মোর গান ভালবাসো’ -হয়তো সেজন্যই ভাইজান অমন করে কিশোর কুমারের গানগুলোই বেশি করে গাইতো— যেন সে জানতো— ”আমি তাই গেয়ে যাই, গান শুনে তুমি কাছে যাতে ছুটে আসো, মোর গান ভালবাসো’ –তোমাকে আমরা আজও ভালবাসি ভাইজান মনে গহীন আজো তোমার জীবন্ত বসবাস। আজও মনে হয়, এই তো সে বাসায়, অফিস থেকে এলো, আনমনে গান শুনছে, হাসছে, হাসাচ্ছে, আত্নীয় স্বজনের সমস্যায় এগিয়ে যাচ্ছে। সকলের সাথে যোগাযোগ রেখে পারিবারিক বন্ধন মজবুত করছে। এখনো মনে হয়, “সে যেন আমার পাশে আজো বসে আছে, চলে গেছে দিন তবু আলো রয়ে গেছে—
যেখানে প্রদীপ ছিলো সেখানে আঁধার
নয়নের জল হয়ে ফিরে এলো সে আবার
সে যেন আমার পাশে– আজো বসে আছে”।

“সে যেন আমার পাশে, আজো বসে আছে”

আর সকলের মত কিশোর কুমারের গান আমার খুব প্রিয়, কিন্তু ইচ্ছে করেই শুনি না আর। শুনলেই চোখ…

Posted by Mahadhe Hasan Kingshuk on Wednesday, May 27, 2020

মন্তব্য করুন