মেহেদী হাসান কিংশুক।।

আমার জীবন চক্রে কিছু জ্বলজ্বলে চরিত্র আছে যাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমার বন্ধু বা শুভাকাঙ্খী। আজ তাদেরই একজন, দু’চাকার লম্বা সীটওয়ালা হিরো সাইকেলের মালিকটি আমার জীবন ঘনিস্ট অনেক চরিত্রের একটি অন্যতম- সে আমার বাল্য- কৈশোর- তারুণ্য এবং এই মাঝ বয়সী সময়ের বন্ধু- সৈয়দ আরিফুল ইসলাম আরিফ। রংপুরে পরিচিতি মহলে তাকে এখনো বিশ্ব আরিফ বলেই চেনে। চরিত্রটি অমার জীবনে এমন একটি সময়ে অবদান রেখেছে, যেটা না হলে বাল্য সময় থেকে দেখে আসা স্বপ্ন পূরণে একটি পথের সন্ধান পাওয়া বড্ড দুরুহ হয়ে যেত হয়তো আমার জন্য।

খুব মনে আছে একদিন দুপুর বেলা, বৃহস্পতিবার, হাফ স্কুল শেষে বাসায় এসেছি, আরিফ এসে বললো,বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে যাবি, ওখানে বই পড়া হয়, বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েরা আসে। সাতটা বই পড়লেই পুরষ্কার। আমি রবার্টসনগঞ্জ স্কুলে আর ও জিলাস্কুলে আমরা সহপাঠি। আমি হীনমণ্যতায় ভূগছিলাম, ওদের সাথে মিশতে পারবো কিনা, কত কঠিন মোটা মোটা বই না পড়তে হয়, আবার শুক্রবারের সারা দিনের খেলা বাদ দিয়ে বই পড়া, স্কুলের পড়া—- ধুরওও—না হবে না। আরিফ নাছোড় বান্দা। অনেক কথায় সিদ্ধান্ত নিলাম দুটি, ১. গিয়ে দেখতেই পারি, না হলে বাদ আর, ২. আরিফের সাইকেলে যাওয়া আসা-তাই রিক্সাভাড়ার চিন্তাটা নেই। —তারপর পরদিন,দুরু দুরু বুকে টাউন হলে ১৯৮৮ সালের মে- বা জুন মাসে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রর বই পড়া আসরে প্রথম যাওয়া। এই টাউন হলে প্রথম গিয়েছিলাম ১৯৮৪ সালে কোরাস গান গাইতে—সে আর একটি চরিত্র আছে, তাকে নিয়ে অন্যদিন।

না, ঐ চিন্তার প্রথমটির প্রথম অংশই টিকে গেল আর দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত এবং আরিফের সাইকেলের যাদুই জয়ী হলো। তবে, একটা সমস্যা ছিলো, সাইকেলের মালিক হিসেবে, যাওয়ার সময় ও কখনো সাইকেল চালাতো না, গা ঘামে ভিজবে বলে। —৮৯ থেকেই খেলাধুলায় ছেদ পড়েছে। আর ফেরা হয়নি সেখান থেকে- কারণ ফিরতে চাইনি। ১৯৮৮ সাল থেকে আমি মিশে গেছি রংপুর শহরের প্রাণ কেন্দ্রে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, তারপর ৮৯ থেকে নাটকের সংগঠন রংপুর পদাতিক, কবিতা সংগঠন কণ্ঠস্বর, সম্মিলিত সাংস্কুতিক জোট—এসবেই কেটেছে সময় দিন রাত, দিন, যদি বলি ২৪ ঘন্টা — ভূল বলা হবে না। আরিফের সাইকলে ছিলো বিশ্বস্ত সঙ্গি, সারা রংপুর চষে বেড়াতাম সংগঠনের কাজে। মনে আছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৮৯ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত সমন্বয়কারী ম্যাজিষ্ট্রেট স.ম নাসির হায়দার স্যারের কথা। মানুষটির কবিতা আবৃত্তি বিমোহিত করতো। সে সময় বিপ্লব প্রসাদ দা,প্রয়াত বাবলু ভাই, রাংগা ভাই, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ ভাই,নবীব লাভলু ভাই, রুজু ভাই, রতন দা, নজুভাই, অমিয় মুরতাজ ভাই, আশাফা সেলিম ভাই, মানিক দা, সুধা দা, লিরা আপা, মুন্নি আপা, বনানী সামাদ আপা, অমিতাভ রেজা ভাই, ফিরোজ চৌধুরী ভাই, আল আমিন ভাই, রাজ বিশ্বাস দা, মাসুদ ভাই, মাহাতাব লিটন ভা্দইদেরকে ঘনিষ্ঠভাবে পেয়েছি। নাটক কবিতায় তাদের সাথে চর্চা ও মেলামেশা করতে গিয়ে মনে হতো -একি কাদের সাথে মিশছি এরা তো রংপুরের এক একটা নক্ষত্র, যাদেরকে মানুষ চেনে সংস্কৃতিবান, প্রগতিশীল এবং ভালো মানুষ হিসেবে। সত্যিই সে এক মহা আনন্দ। লেখাপড়া ঠিকই চালিয়েছি, মন দিয়ে পড়াশুনাও করেছি, তার কারণ ঐ পরিবেশে মেশা তবে সারাটা সময় নাটক-কবিতাই ঘোর লেগে রাখতো। দেখছি এখানে যারা আসে তারা শুধূ কবিতা আবৃত্তি, নাটক, গান বা নাচেই শ্রেষ্ঠ ,নয় লেখাপড়াতেই ভালো। আর মধ্যবিত্ত চেতনার আবেশে নিজেকে গড়ার একটা চেষ্টাও ছিলো বৈকি।

মনে আছে,৮৮- এর শুক্রবার এবং ৮৯ এর সারাটা সপ্তাহ ছিলাম ভীষন ব্যস্ত। সকালে বিশ্ব সাহিত্য থেকে এসে নামাজ এবং খেয়েই দিতাম দৌড় কবিতার সংগঠনে, ৮৯ থেকে নাটকের সংগঠন রংপুর পদাতিকে এবং বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে সমানতালে। ৮৯ এর প্রেথম দিকে, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, সুযোগ পেলাম একক একটা ভূমিকাভিনয় করার। যেটা সুজন ভাই ক্লাস ফাইতে করতো ,তখন আমি ক্লাস ত্রিতে পড়তাম। ওটা সপ্তম শ্রেণি থেকে স্কাউটে পরিবেশন করতে করতে বেশ পোক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, একক অভিনয়টা দেখে মানুষ মজাও পেত। সেটাই করে ফেললাম। মঞ্চ থেকে নেমেছি, গোফ ওয়ালা এক বড় ভাই বললো,তুমি নাটক করবে, রংপুর পদাতিক, তাহলে আমার বাসায় এসো বিকেল ৩টায়। আহ কী আনন্দ আকাশে বাতাসে!!! সেদিন রতনদাকে মনে হয়েছিলো আমার এহতেশাম আর আমি নাঈম। আমি পদাতিকে যাওয়ার পরদিন আরিফকেও নিয়ে আসি পদাতিকে।

আরিফের সাথে আমার অমিলও ছিলো প্রচুর- চিন্তায়, কাজে- হয়তো এখনো আছে। কিন্তু কোথায় যেন একটা বিন্দুতে শক্ত মিল আছে। সেই মিল ছিলো বুঝি, আমরা দুজনে ভালো জানতাম, আমাদেরকে আমাদের চেষ্টাতেই যা করার করতে হবে, চর্চা করে করে নিজেদেরকে শাণিত করলে হবে, দৈব লোক থেকে কিছু আসবে না। ৮৮ থেকে ৯০ অবধি সমবয়সী, ছোট বা বড়দের সাথে সে ইতিবাচক প্রতিযোগিতাটা তখন মোটেও সহজ ছিলো না আমাদের। ’হাল ছেড়ো বন্ধু’র মত মতই আমরা লেগে ছিলাম এই যা, সেটাই ছিলো আমাদের একমাত্র অবলম্বন।

আরিফের ভালোগুণ আছে অনেক। আমাদের পাড়ার আমাদের বয়সী বা তার থেকে একটু বড়দের মধ্যে আরিফই এখনো একজন যে আজও একটি সিরাগারেট কিভাবে ধরাতে হয় জানে না, কখনো জুয়া খেলেছে বা রাজনৈতিক কোন মিছিলে গেছে, মারপিট করেছে- অসম্ভব। মানুষের কিছু হলে এগিয়ে যেত, যাদেরকে পছন্দ করতো না, কোন ভনিতা না করে তাদের এড়িয়ে চলতো। সে জন্য অনেক কথা শুনতে হতো, আমিও বলেছি। এ নিয়ে সমবয়সী- বড়দের সাথেও কত মারপিট ( অপ্রত্যাশিতভাবে) হতো ওর একরোখা স্বভাবের জন্য। এ এক সময় দুজন দুদিকে গিয়েছি, আমাকে নাটক টেনেছে খুববেশি, তাই সুন্দর এক বিকেলে দারুণ এক মত মালিন্ন হলো আমাদের । ওকে বলে ছিলাম, ভাই তুই বিশ্ব সাহিত্যে থাক , আমি একই সময়ে দু’খানে পারছি না, আমাকে পদাতিকই টানছে। ব্যস -আর যাইনি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। ১৯৯১ সাল থেকে পুরোপুরি নাটক আর কবিতাতেই ছিলো মননিবেশ। সৈয়দ আরিফ, আমার বন্ধু- বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে আজও আছে। রংপুর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র আর আরিফ -একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আগে নিজে বই পড়তো এখন অনেক ছেলেমেয়েকে বই পড়াতে কাজ করছে। নিজে একটা সুন্দর বই কাম কফি শপ দিয়েছে প্রমিতি নামে। মিষ্টি একজন ছেলে আর সংসারি সহধমির্নীসহ রংপুরেরই নিজ বাড়িতে থাকে। একজন ভালো সংগঠক, গুণি সংস্কৃতিকমী-নেতা সৈয়দ আরিফকে বিশ্ব আরিফ নামেই চেনে সকলে। ওর অনেক সাগরেদ আছে- ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, শিক্ষক- সকলে এখনো আরিফ ভাই বলতে পাগল। এরকম পাগল মানুষ না থাকলে হাজার হাজার তরুণ স্বপ্ন দেখবে কিভাবে?

আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ আরিফ তোর কাছে। তোর দু’চাকার বাই সাইকেলটার কাছে। তোর জন্যে কিছু করতে পারি নাই, এই কৃতজ্ঞতাটুকুই লিখে জানিয়ে আমার জীবনচক্রের জড়িত থাকা চরিত্রটাকে না হয় তোকে এটুকু ভালবাসা দিলাম আজ।

মন্তব্য করুন