আমি নবাব। সত্যির না। নামের। তবে আমার স্ত্রী কাছাকাছি নবাব। প্রায় নবাব ফয়জুন্নেসা- আরামআয়াস খাওয়াখাওয়ানো দয়াদান ব্যয়বিলাসে মন খোলা। হাত খোলা। এক কথায় অসাধারণ। পরিবার প্রতিবেশি স্বজন পরিজন সবার সে প্রিয়। কোনো দিন কোনো কাজে তার অসুবিধা হয় না। পোশাক শিল্পে দেশ ভরে গেছে, ভরুক। মফসলের সাধারণ মেয়েসব শহরে এসেছে, আসুক। জনশক্তির আকাল পড়েছে, পড়ুক না। ওসবে আমার স্ত্রীর অসুবিধা নেই। তার কাজের লোক আছেই। নিয়মিত তিনজন। অনিয়মিত ছয় সাতজন। তার কাজের সহযোগিতায় ফ্যালকন প্লাজার কর্মচারি ম্যানেজার সবাই তালগাছ- মানে এক পায়ে দাঁড়িয়ে।

আমার স্ত্রীর সেই সুদিন নেই। এখন দুর্দিন। দুঃসময়। কাজ আছে কাজের লোক নেই। বাসাবন্দি বসবাস। ভিতর থেকে বাইরে যাওয়া বাইরে থেকে ভিতরে আসা একরকম নিষেধ।

আমার স্ত্রীর দুর্দশা চরম- বাসার বাটাপেশা কাটাকাটি রান্নাবান্না পরিবেশন করতে হচ্ছে। হাড়িপাতিল থালাবাসন কাপড়চোপড় ঘরমেঝে ধোয়ামোছা সব সে কোরছে। একে তো অভ্যাস নেই। তার ওপর এতো কাজ। তার ওপর ভারি শরীর। অবস্থা করুণ। অসীম কষ্টের। দম যায়যায়।

আমি ক্লিনিকে কাজ করি। হৃদয়রোগীর সেবাদান। সাত সকালে বেরোই। বাসায় ফিরি রাতে। তখন সময় থাকে না। সদিচ্ছা থাকে না। স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা? সত্যি বোললে শূন্য।

বাসায় তিনজন যুবক আছে। দু’জন আমাদের সন্তান। একজন শ্যালিকার। খুব দুঃখের, আমাদের মেয়ে নেই। ছেলে তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তাদের পড়াদক্ষতা ভালো। ফলদক্ষতা ভালো। গৃহবিদ্যালয় বিষয়ে দক্ষতা দীন। তা কতোটা বলা যাবে না। বোললে দয়া হবে। দুঃখ হবে। তবে দোষের মনে হবে না।

গৃহবিদ্যার পড়া ও করা তারা জানে না। জানে না মানে- তাদের পড়ানো হয়নি। করানো হয়নি। তাই দুঃসময়ে তাদের মামনি খালামনি সহযোগিতা পাচ্ছে না। সহানুভূতিও পাচ্ছে না। আমি তো বোলবো- এ বিশুদ্ধ বেদনার।

আমার স্ত্রী- কি সেই শুরু থেকে আমার স্ত্রী আমার স্ত্রী বোলছি। তার কি নাম নেই? নাকি নাম বলা যাবে না? ধারণা দু’টির একটিও ঠিক না। নাম আছে। নাম বলাও যাবে। নাম দোলা।

দোলা ছেলেদের গৃহবিদ্যার কিছু শেখায়নি। শেখায়নি মানে শেখাতে চায়নি। সন্তান দিয়ে কাজ করানোয় তার খুব আপত্তি। তার কষ্ট লাগে। আমি যদি শেখাতে চেয়েছি- জগে পানি আনো তো, নিজের প্লেট ধুয়ে রাখো, নিজের বিছানা গুছিয়ে রাখো, মামনির ওষুধটা কিনে আনো, তো দোলা রাগ করেছে। তোমার দয়ামায়া নাই, সন্তান দিয়ে কাজ করাও। তবু ছেলেদের ভালোটা ভেবে অনেক দিন চেষ্টা করেছি। সফল হইনি। না হলাম। আমি পরিবারে শান্তিময় সুস্থসময় পেতে চেয়েছি। তাই সন্তানকে শেখানো এখন শিকেয়।

দোলাকে বোললাম- দেখ, ছেলেদের এটাসেটা ঘরকাজ শেখা থাকলে, আজ কতো সুবিধা হতো। ওরা তোমাকে সাহায্য কোরতো। লাগবে না ওদের সাহায্য। তুমি সাহায্য কোরছো? দিনরাত অফিসে কাটাও। পাও খাও আড্ডা দাও। ভেবেছো জানি না? বুঝি না? বুঝবে না কেন, বুঝবে তো বটেই। দুঃখ কি জানো, বোঝো ভুল।

দোলা এমনিতেই রাগী। তার ওপর কাজেকাজে হাঁপিয়ে উঠেছে। শরীর মন বিষিয়ে উঠেছে। রাতে বাসায় ফিরে ওকে দেখে ওকে শুনে খারাপ লাগে। রোজ বলি এতো কাজ করো না। শোনে না। আমি কাজ না কোরলে কোরবেটা কে? কেন নাজমাকে ডাকো।

নাজমা দোলার বুয়া। দোলাকে আপা ডাকে। দোলাকে ভালোবাসে। বেহিসেব কাজ করে। তিরিশ নিচে বয়স। গুণী। স্বভাব সৎ। বিবাহিত সিঙ্গেল। স্বামি রেখে চলে গেছে। শালা স্বামি। যাকগে, নাজমার বাড়ি জামালপুর। বুড়োবাবা আর বিমাতা নিয়ে ঢাকায় থাকে। আমরা তাদের দেখিনি। নাজমার বাবা নাকি অদেখা দোলাকে খুব মায়া করে। দোলার অসুখ শুনলে দোয়া করে। রোজা করে।

দোলা-নাজমা বোঝাপড়া বেশ। দু’জনই নিবেদিত। নাজমা কাজে দোলা কর্তব্যে। দোলা খাবার যা-ই কিনুক যা-ই রাঁধুক নাজমাকে দিবেই। আবার যাবার সময় ওর বাবার জন্য ভাত তরকারি কলা মুড়ি বিস্কুট চা চিনি দুধ যা লাগে দিবে। নাজমা একটু বেশি কাজ করেছে তো তখনতখনি দু’তিন শ’ টাকা হাতে গুঁজে দিবে। এছাড়া পুরোনো নতুন জামাকাপড় বালতি মগ ফ্যান টিভি খাট ম্যাট্রেস সব দিবে নাজমাকে। নাজমাও অনেক দেয়। দোলার জন্য কি-কি করে কতোটা করে চোখে দেখেও বিশ্বাস করা কঠিন। পারে তো আপার জন্য জানটাও দেয়।

দোলার বিপদ হয়েছে নাজমা না আসায়। এখন সব বাসাতেই বাইরে থেকে বুয়া আসা নিষেধ। বোললাম, ফোনে নাজমাকে বলো আমাদের বাসায় থেকে কাজ করুক। ও থাকবে কিভাবে? ওর বুড়োবাবা আছে। তাছাড়া ওকে তো সিকিউরিটি আসতে দিবে না। আগে কথা বলে দেখ না। আমি ম্যানেজারকে বলে রাখবো।

রাতে ক্লিনিক থেকে ফিরেছি। দেখি নাজমা রান্নাঘরে কাজ কোরছে। ও ব্যাগপেটরা চলে এসেছে। বাসায় কয়েক দিনের খাবার ব্যবস্থা রেখে এসেছে। উফ্ কী উদ্ধার। দোলার মুখ দোলার মন প্রসন্নতায় পুরো।

আমরা হোম কোয়ারেন্টাইনে কাটছি। বিশবাইশ দিন কেটেছে। ছেলেরা পুরোপুরি বাসায় থাকছে। ওদিকে স্টাফ রোগী সবাই আছে ক্লিনিক কোয়ারেন্টাইনে। কেবল আমি বাসা-অফিস-বাসা কোরছি। দেখলাম নীতিখেলাপ। দেখলাম বাসা কিংবা অফিস একদিক নিতে হবে। দেখলাম সবার জন্য আমিই ঝুঁকির। সবদিক ভাবলাম। দোলাকে বোঝালাম। না এ হয় না। দেখ এ-ই হতে হবে। অবশেষে আমি অফিসে থিতু হলাম।

বাসা ক্লিনিক ঠিকঠাক চোলছে। দোলার সাথে রোজ ফোনালাপ হচ্ছে। একদিন ফোন পেয়ে আঁতকে উঠলাম- নাজমাদের তোলারবাগে একজন বুড়োলোক করোনায় মারা গেছে। বলো কি! হ্যাঁ টিভিতে বোলছে। নাজমার বাবা মা ভালো আছে তো? ওকে খোঁজ নিতে বলো। খোঁজ নিবে কিভাবে, ওর বাসায় ফোন নাই। তাই? ওর বাবার নাম জেনে আমাকে জানাও তো। তোলারবাগের জামালপুরের ঠিকানাও জেনো।

মিনিট বিশেক পরেই দোলার ফোন। যা জানার জানলাম। নাজমাকে কিছু বলোনি তো? বারবার জানতে চাওয়ায় তোলারবাগে একজন করোনায় মারা গেছে বোলছি। নাজমা এ ক’দিনে করোনা কি কিছুকিছু জেনেছে। আসার সময় ওর বাবার অল্প জ্বর ছিল। কাশি ছিল। এখন সেটাই মনে করে ভয়ে কাঁদছে। বোলছে, আপাগো আমি তাইলে বাড়িত যাই? আরে না না বাড়িতে যাবে কি। কে না কে মারা গেছে। ওকে কাঁদতে মানা করো। আমি খোঁজ নিচ্ছি।

আইইডিসিআর হট নম্বরে ফোন দিলাম। ব্যস্ত। আবার দিলাম। ব্যস্ত। সব নম্বরে সবমিলে বার বিশ ফোন দিলাম। ফলাফল শূন্য। আমাদের মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট রবিন। ছেলেটা চৌকস। মিরপুর দশে থাকে। ওকে পাঠালাম ওখানে।

অফিসে এটাসেটা রুটিন কাজ কোরছি। কেন যেন মনে একটা সন্দেহ শুরু হলো- নাজমার বাবা অসুস্থ ছিল বয়স্ক মানুষ। ঘণ্টা দুই পর রবিনের ফোন- স্যার রিপোর্ট পজেটিভ। অ্যাঁ! ঠিক মতো জেনেছো তো? জ্বি স্যার। তুমি কোথায়? আইইডিসিআর থেকে বোলছি স্যার। আপনার কাগজে লেখা লোকটাই মারা গেছে। নাম ধাম ঠিকানা হুবহু এক স্যার। আমি নিশ্চিত হয়ে আপনাকে ফোন দিয়েছি। ওকে, তুমি চলে আসো।

রবিন ফিরলো অফিসে। কী কঠিন বাস্তবতা। একটু আগের কাছেরজন দূরেরজন হয়ে যায়। বোললাম ওখানে দাঁড়াও। তারপর সবটুকু শুনলাম। নাজমার বাবা তখন বেশি অসুস্থ। মহল্লার কে একজন খবর দেয়ায় আইইডিসিআর অ্যামবুলেন্স পাঠিয়ে তাকে নিয়ে গেছে। সেখানে দু’দিন পর নাজমার বাবা মারা যায়। নাজমার মাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।

অভাবিত ঘটনায় কেমন যেন মুষড়ে গেলাম। কি কোরবো কি বোলবো সাতরকম ভাবছি। এরমধ্যে দোলার ফোন- জানতে পারছো তোলারবাগে করোনায় কে মারা গেছে? হুম। কে? নাজমাকে বোলো- ওর বাবা মারা যায়নি, হাসপাতাল থেকে চলে গেছে অন্য কোথাও।

মন্তব্য করুন