জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
১৪ মে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

এক নজরে ড. আনিসুজ্জামান

মৃত্যু:
২০২০ সালের ১৪ মে বিকাল ৪.৫৫ মিনিট

জন্ম:
১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন আনিসুজ্জামান।

পরিবার-পরিজন:
বাবা ডা. এটিএম মোয়াজ্জম, পেশায় ছিলেন হোমিও ডাক্তার। মা সৈয়দা খাতুন, গৃহিনী। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনিসুজ্জামানরা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। আনিসুজ্জামানের স্ত্রী সিদ্দিকা জামান। তাঁদের দুই ছেলে, এক মেয়ে।

পড়াশুনা:
কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে শিক্ষাজীবনের শুরু করেন। ওখানে পড়েছেন তৃতীয় শ্রেণী থেকে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত। পরে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। একবছর পরই ঢাকায় চলে আসেন। ভর্তি হন প্রিয়নাথ হাইস্কুলে। ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। ওই কলেজ থেকে আইএ পাস করে বাংলায় অনার্স নিয়ে বিএ ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৬ সালে অনার্স ও ১৯৫৭ সালে এমএ পাস করেন।

কর্মজীবন:
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২ বছর। প্রথমে অ্যাডহক ভিত্তিতে চাকরি হলো তিন মাসের। তারপর কেন্দ্রীয় সরকারের গবেষণা বৃত্তি পান। পরে আবার যোগ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায়। ১৯৬২ সালে তাঁর পিএইচডি হয়ে গেল। ১৯৬৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে যান ডক্টরাল ফেলে হিসেবে বৃত্তি পেয়ে।

১৯৬৯ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই অবস্থান করেছিলেন। পরে ভারতে গিয়ে প্রথমে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকল্পে অংশ নেন ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ঢাবি থেকে অবসর নেন ২০০৩ সালে। পরে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে আবার যুক্ত হন। তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ (কলকাতা), প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থ ক্যারোলাইন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। এছাড়াও তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি শিল্পকলা বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘যামিনী’ এবং বাংলা মাসিকপত্র ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

লেখালেখি:
তাঁর রচিত ও সম্পাদিত বহু বাংলা ও ইংরেজি বই রয়েছে। যেগুলো আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিবেচনায় খুবই গুরুত্ববহ। তাঁর প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে- মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, মুনীর চৌধুরী, স্বরূপের সন্ধানে, Social Aspects of Endogenous Intellectual Creativity (1979) Factory Correspondence and other Bengali Documents in the India Official Library and Records, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পুরোনো বাংলা গদ্য, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, Creativity, Reality and Identity, Cultural Pluralism, Identity, Religion and Recent History, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, আমার চোখে, বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে, পূর্বগামী, কাল নিরবধি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদও করেছেন। এর মধ্যে- অস্কার ওয়াইল্ডের ‘An Ideal Husband‘ এর বাংলা নাট্যরূপ ‘আদর্শ স্বামী’, আলেক্সেই আরবুঝুভের ‘An Old World Comedy‘ -র বাংলা নাট্যরূপ ‘পুরনো পালা’। এছাড়াও অসংখ্য গ্রন্থ একক ও যৌথ সম্পাদনা করেছেন তিনি। এর মধ্যে- রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর-রচনা সংগ্রহ (যৌধ), Culture and Thought (যৌথ), মুনীর চৌধুরী রচনাবলী ১-৪ খণ্ড, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড’ (যৌথ), অজিত গুহ স্মারকগ্রন্থ, স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ, নজরুল রচনাবলী ১-৪ খণ্ড (যৌথ), SAARC : A People’s Perspective, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মকথা, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচনাবলী (১ ও ৩ খণ্ড), নারীর কথা (যৌথ), ফতোয়া (যৌথ), মধুদা (যৌথ), আবু হেনা মোস্তফা কামাল রচনাবলী (১ম খণ্ড, যৌথ), ওগুস্তে ওসাঁর বাংলা-ফরাসি শব্দসংগ্রহ (যৌথ), আইন-শব্দকোষ (যৌথ) উল্লেখযোগ্য।

পুরস্কার-সম্মাননা:
পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে- নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৬), স্ট্যানলি ম্যারন রচনা পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৮), দাউদ পুরস্কার (১৯৬৫), বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০), অলক্ত পুরস্কার (১৯৮৩), একুশে পদক (১৯৮৫), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৬), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৬), বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার (১৯৯০), দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক (১৯৯৩), অশোককুমার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৪)। সম্মাননার মধ্যে- রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি. লিট (২০০৫)। কোলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বর্ণপদক (২০১১); ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসরকারী উপাধি ‘পদ্ম-ভূষণ’ (২০১৪)।

(তথ্যসহযোগিতা নেওয়া হয়েছে- আমার একাত্তর, লেখক- আনিসুজ্জামান, ১৯৯৭; কালনিরবধি, লেখক- আনিসুজ্জামান, ২০০৩, লেখক অভিধান, বাংলা একাডেমী, ২০০৮, gunijan.org.bd)

 

মন্তব্য করুন